6 Ashin 1428 বঙ্গাব্দ মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ »
Home / সর্বশেষ / হতাশ সাংবাদিকরা কি মিনার মাহমুদ এর পথ ধরবেন ?

হতাশ সাংবাদিকরা কি মিনার মাহমুদ এর পথ ধরবেন ?

 

জাকির হোসেন : 

প্রয়াত সাংবাদিক মিনার মাহমুদের জন্মদিন গেল গত ১০ মার্চ। ফেসবুকে তাকে নিয়ে অনেকের আবেগঘন স্যাটাস দেখেছি। অনেক মিডিয়াতেও তাকে নিয়ে ফিচার প্রকাশিত হয়েছে। এসব লেখা পড়লে সহজেই বোঝা যায় মিনার মাহমুদ বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একজন নক্ষত্র ছিলেন। যিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যও লড়াই করেছেন তার কলম দিয়ে।

মিনার মাহমুদের মৃত্যুর পর গণমাধ্যমে অনেক আবেগঘন ভাষায় খবরটি প্রকাশিত হয়। সহজেই বুঝা যায় তার মৃত্যুকে অনেকেই বিশেষ করে সাংবাদিক সমাজ মানতে পারছিলো না। খবরগুলো পড়ে মনে হচ্ছিল এভাবে কেন তিনি চলে যাবেন?

আমার সাথে সাংবাদিক মিনার মাহমুদের পরিচয় নেই। কখনো দেখাও হয়নি। তবে বিচিন্তা আমি পড়তাম। ভালো লাগতো। বলা যায় ভালো পাঠক। তার মৃত্যুর খবরটি যেদিন আসে সেদিন আমি পাঠক ছিলাম না। ছিলাম সাংবাদিকও। আজ যতটুকু মনে পড়ছে হয়তো খবরটি আমিই এডিট করেছিলাম। সেদিন নিউজ রুমে বসে একটা ভাবনা হয়েছিল, এটাই কি একজন সাংবাদিকের পরিনতি? এর কারণ ছিল তার লেখা চিঠির ভাষা। স্ত্রীকে লেখা চিঠির একটা অংশে তিনি লিখেছিলেন,

[“এখন শোনো লাজুক। আমি সর্বহারা। ‘কিছু নেই’ একজন মানুষ। বিচিন্তা আবার প্রকাশ করেছিলাম, পাঠকরা নেইনি। পরে একটি চাকরির জন্য কত চেনা অচেনা পত্রিকা মিডিয়ায় চেষ্টা করেছি কেউ নেইনি। অবাক হয়েছেন নিয়মিত লেখা এক সাংবাদিক। হাজিরা দেব, নিয়মিত লিখব, মাস শেষে একটা বেতন কোথাও হয়নি। কাউকে অভিযোগ করিনি।
লাজুক, বেশ কয়েক দিন ধরে চিন্তা করেছি-মৃত্যু। তারপর কোথায়? এরপর কি জীবনের আর কোন ফিরে পাওয়া। খুব অবাক হয়েছি, বাংলাদেশের কোন দৈনিক পত্রিকায় আমার স্থান হলো না।”]

 

গোট চিঠির মধ্যে শুধু এই অংশটি অনেকগুলো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। চিঠির এই অংশেই আছে একজন সাংবাদিকর আকুতি, অসহায়ত্ব, যন্ত্রণা, অভিমান, অপমান, আর্থিক টানা পোড়েন, প্রতিশোধ ও প্রতিবাদ।

 

চিঠির এই অংশটির মধ্যদিয়ে মিনার মাহমুদ দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি কত বড় মাপের সাংবাদিক ছিলেন। আসলেই তো তাকে ধারণ করার মতো সংবাদপত্র কি ওই সময় আমাদের দেশে ছিল? ছিলো না। তাই তো জীবনের চাকা সচল রাখতে, স্ত্রীকে নিয়ে দু-বেলা ডাল খেয়ে বেঁচে থাকতে একটি চাকরি তিনি খুঁজেছিলেন। তা তিনি পাননি। মিডিয়ার কর্তা ব্যক্তিরা তার প্রতি এটুকুও সহানুভূতি দেখাতে পারেননি। যদিও নিজেরা ঠিকই জায়গা করে নিয়েছিলেন। মূলত দুটি কারণে মিনার মাহমুদ সেদিন মিডিয়াতে চাকরি পাননি। এক. মিডিয়ার কর্তা ব্যক্তির ভূমিকায় যিনি আছেন তিনি হীনমন্যতায় ভূগেছেন, নিজের অবস্থার নড়বড়ে হয়ে যাবে ভেবেছেন, দুই . মিনার মাহমুদ যেনো আবার জেগে উঠতে না পারেন তার পথ রুদ্ধ করেছেন।

সাংবাদিক মিনার মাহমুদকে নিয়েবেশি কিছু লিখার সাধ্য আমারনেই। কিন্তুযে কারণে প্রসঙ্গের অবতারনা তা হলো, বর্তমানে শুধু ঢাকা শহরে কয়েক শত মিনার মাহমুদ আছেন যারা একটা চাকরির জন্য ঘুরছেন আর ঘুরছেন। কিন্তু নিজের দৈন্যতার কথা কাউকে বলতেও পারছেন না , বুঝাতেও পারছেন না। মিনার মাহমুদের সময় ঢাকা শহরে শুধু সংবাদ পত্রের রাজত্ব ছিল। সে সময়ের তুলনায় আজ মিডিয়ার সংখ্যা কয়েকগুন বেশি। তবু শত শত মিনার মাহমুদ হয়ে ফিরছেন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকরা।

কিছু দিন আগে একটি মিডিয়ার কর্তা ব্যক্তিদের একজনের সাথে কথা। তিনি বলছিলেন, মিডিয়ার এখন বাজে অবস্থা। বিজ্ঞাপণ নাই, আয় কমেগেছে। সিনিয়াদের দিয়ে টানা যাচ্ছে না। জুনিয়ার দিয়েই চালাতে হবে। অনেকেই তাই করছে। আসলেই খোঁজ নিয়ে জানলাম, বেশির ভাগ অনলাইন মিডিয়াই জুনিয়রদের দিয়ে কাজ চলছে। পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সিনিয়রদের ছাঁটাই করা হয়েছে এবং হচ্ছে। বিষয়টা এমনযে, সাংবাদিকতা কোন বিষয় না। নিজের পদটা ঠিক রাখি বাকিরা চলে যাক।
প্রশ্ন হচ্ছে এ অবস্থা কেন? একজন সিনিয়র সাংবাদিক তো একলাফেই সিনিয়র হয়ে যাননি। তিনি ধাপে ধাপে এগিয়েছেন। আর কেউ যদি একলাফে এগিয়ে থাকেন, তবে সে সুযোগ তো যৌবনে আপনিই করে দিয়েছেন। তবে আজ সিনিয়রদের প্রয়োজন ফুরালো কেন? একবারও কি ভেবেছেন এ বয়সে তিনি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন? না ভাবলেও ক্ষতি নেই। সমস্যা হচ্ছে তিনি আর কোথাও গিয়ে দাঁড়াতেই পারছেন না। ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা নিয়েও না। একজন মানুষ যখন ক্যারিয়ার হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নেন। ২০ বা ২৫ বছর সাংবাদিকতা করার পর তিনি কোথায় যাবেন। কি করবেন। করলে তো সাংবাদিকতাই করতে হবে। তিনি সিনিয়র বলে তাকে চাকরি দেয়া যাবে না, এ মনোভাব কি ঠিক?

বর্তমান করোনা কালে বিশ্ব বাণিজ্যের মন্দকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমরা ছোট্ট দেশ হিসেবেও এ ক্ষতির বাইরে নই। এই করোনাকালে যে কটা সেক্টর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মধ্যে গণমাধ্যম অন্যতম। কিন্তু এই ক্ষতি পূরণে কোনো প্রকার সহযোগিতা বা প্রণোদনা নেই। যার খেসারত দিতে হচ্ছে  সাংবাদিকদের। অন্যদিকে মিডিয়ার মালিকরাও মিডিয়াকে সেকেন্ডারি ব্যবসা হিসেবে দেখেন। মিডিয়াকে অন্যন্য ব্যবসার হাতিয়া হিসেবে ব্যবহার করেন। এ কারণে অনেক মিডিয়াতেই নিয়মিত বেতন হয় না। ওয়েজ বোর্ড কার্যকর হয় না।

প্রকৃত পক্ষে এ অবস্থার পথ তৈরি হয়েছে সাংবাদিকদের হাত ধরেই। যে কারণে সাংবাদিকতা পেশার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। সাংবাদিক সংগঠনগুলো চলছে রাজনীতির দলাদলীতে আর মিডিয়া হাউজ চলছে সুযোগ সন্ধানীদের দাপটে। কিছু দিন আগে একটি দৈনিকের কর্মচারি ছাঁটাইয়ের জন্য মালিক পক্ষ কয়েকজন সাংবাদিক নেতাকে হায়ার করে।  তারা সফলও হয়। পত্রিকাটি ‘এ’ ক্যাটাগরিতে বিজ্ঞাপন ঠিকই নিচ্ছে, কিন্তু ছাপার যে হার তার কোনো ক্যাটাগরিতেই পরে না। তাহলে বিষয়টি যা দাঁড়ায় তা হলো মালিকের খরচ কমানোর এ প্রক্রিয়া সহযোগী সাংবাদিক সমাজেরই একটা অংশ। এদের রুখিবে কে?

মিনার মাহমুদ কি কারণে আত্মহত্যা করেছিলেন তা জানি না, তবে তার লেখা চিঠির একটা অংশে যে হতাশার কথা লিখেছেন, সে হতাশ সাংবাদিক আজ একজন দু-জন নয়, তাদের সংখ্যা শত শত। সুদৃষ্টি না থাকলে মিনারের পথে হাঁটা ছাড়া গত্যান্তর থাকবে না অনেকেরই।

zakpol74@gmail.com

আরও পড়ুন...

করোনায় শনাক্ত পাঁচ শতাংশের নিচে

  সাড়ে ছয় মাস পর দেশে করোনায় শনাক্তের হার পাঁচ শতাংশের নিচে নামল। গত ২৪ …