11 Agrohayon 1427 বঙ্গাব্দ বৃহস্পতিবার ২৬ নভেম্বর ২০২০
Home / সর্বশেষ / মসজিদের আগুন থেকে শেখা

মসজিদের আগুন থেকে শেখা

 

আগুন শব্দটির সাথে আমাদের সবারই পরিচয় আছে। শব্দটির ভয়ঙ্কর রূপ দেখেননি এমন মানুষ পাওয়া ভার । বেশ  কিছুদিন আগে আমাজান এর দাবনল পুরো পৃথিবীকে কাঁপিয়ে ছিল। আর বর্তমানে ক্যালিফোনিয়ার আগুন, কারণ অজানা । বিশ্বের সবচাইতে শক্তিধর দেশটি তা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে । আসলে আগুনের শক্তির কাছে মানব সভ্যতা অতীতেও অনেকবার তুচ্ছ প্রমাণিত হয়েছে ।

বাংলাদেশে প্রতি বছরই নানা কারণে আগুন-দুর্ঘটনা ঘটছে, এর বেশিরভাগই হয়তো অসচেতনা অথবা অবহেলার কারণে । অবশ্য আগুণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকা ও ভয়াবহ পরিণতির সৃষ্টি করে । সম্প্রতি, নারায়ণগঞ্জ মসজিদের ঘটনাই হয়তো তার প্ৰমাণ ।

বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষনে, আগুন মূলত রাসায়নিক বিক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই না । বিক্রিয়া ঘটাতে প্রয়োজন তাপ, অক্সিজেন আর দাহ্য পদার্থ । আর এ তিনটির কোন একটির অভাব আগুন তৈরিতে বাঁধ সাঁধবে ।

ভৌগোলিক ভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়া উষ্ণ-আর্দ্র । বচন আছে ভাদ্র মাস -এর গরমকে বাঘও ডরায় । তবে বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতাই দেশে অনুভূত গরমে আমাদের সহজে পরিশ্রান্ত করে ফেলে । সস্থির বিষয় হলো, আর্দ্রতাই আমাদের যুগের পর যুগ রক্ষা করে চলেছে আগুন ভয়াবহতা থেকে । সুন্দরবন যেমনি আমাদের রক্ষা করছে কঠিন সামুদ্রিক ঝড় থেকে তেমনি দাবানল এর হাত থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করছে ভৌগোলিকগত অবস্থান এর কারণে সৃষ্ট আর্দ্রতা । প্রকৃতি যেন অকুণ্ঠভাবে আগলে রাখছে ছোট ভাটির এদেশটিকে । অথচ দুর্ভাগ্য বসত আমরা খুব কমই প্রকৃতির এই যত্নকে বুঝতে পারি অথবা বোঝবার চেষ্টা করি ।

স্থপতি শাহরিয়ার ইকবাল রাজ
সহকারী অধ্যপক নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

সম্প্রতিকালে নারায়ণগঞ্জে মসজিদে আগুণ লাগার ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্খিত । ঘটনাটি ঘটার পর থেকে সামাজিক মাধ্যম আর মিডিয়াতে বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী ব্যাখ্যা চলতে থাকে । দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, এর অধিকাংশই বৈজ্ঞানিক ব্যাখার কাছাকাছিও ছিল না । আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন জ্ঞান মানুষকে সচেতন করে আর মানব জাতির সমৃদ্ধিতে সাহায্য করে, তেমনি বেঠিক তথ্য ও ভুল জ্ঞান ধ্বংসেরও কারণ হয়ে উঠতে পারে ।

বিজ্ঞানিক বিশ্লেষণে,  এধরনের আগুনকে FLASH FIRE নামে ব্যাখ্যা দেয়া হয় । যখন কোন বদ্ধ জায়গার বাতাসে যদি দাহ্য তরল, কঠিন পদার্থ অথবা দাহ্য গ্যাস এর উপস্থিতি ঘটে এবং কোন প্রকার স্পার্ক অথবা আগুন এর সংস্পর্শ তৈরি হয় তখন সেখানে এধরনের আগুনের সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা দেখা দেয় | এ ধরণের আগুন, হঠাৎ করেই কোন রকম পূর্ব জানান ছাড়াই সৃষ্টি হতে পারে ।

সৃষ্ট আগুনের  স্থায়িত্ব হয় অতি স্বল্প সময়ের জন্য। এই পরিস্থিতিতে মূলত বাতাসে থাকা জ্বালানি জ্বলতে শুরু করে। আগুন যেহেতু বাতাসে ভর করে লাফিয়ে স্থান পরিবর্তন করতে থাকে তাই প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হয় আর বিষ্ফোরণ এর ন্যায় শব্দ তৈরি করে ।  প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হয় আর সে তাপে (৬০০ সেন্টিগ্রেড) প্রাথমিক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট জায়গায় দাহ্য কোন পদার্থের উপরের স্তর ঝলসে যায়। পরবর্তীতে তাতে আগুন  জ্বলতে শুরু করে | আগুনজনিত দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে এধরনের দুর্ঘটনাকে সবচাইতে ভয়ঙ্ককর হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় । অন্যান্য দুর্ঘটনাতে আগুন ছোট আকারে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। কিন্তু FLASH FIRE এর ক্ষেত্রে এর তীব্রতা শুরু থেকেই শুরু হয়। আর বিষ্ফোরণের  কারণে তীব্রতা ভয়ঙ্কর রূপ নেয় । কেবল তাই নয় তাৎক্ষণিক বিস্ফোরনের ফলে জানালা, দরজা ভেঙ্গে যায় এবং বায়ু শূন্যতা তৈরি হয়ে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয় । ফলে দ্রুত গতিতে নতুন ভাবে বদ্ধ জায়গায় অক্সিজেনের প্রবাহ শুরু হয়, যা পরবর্তীতে আগুনের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দেয় | সর্বোপরি অতি অল্প সময়ের মধ্য অনেক ক্ষতি সাধন হয়, যা কিনা বিশ্বের সবচাইতে দ্রুততম ফায়ার সার্ভিসের ক্ষেত্রেও ট্যাকেল করা অসম্ভব ।

বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, যত দুর্ঘটনা দেশে ঘটে তার ৮০ শতাংশই নিছক অবহেলা আর জ্ঞানের অভাবেই ঘটে | সামাজিক জীব হিসেবে উদাসীনতা আমাদের বৈশিষ্ট্য, যা হয়তো এর মূল কারণ |

মসজিদের আগুন ঘটনার ব্যাখ্যা কি?

জনশ্রুতি মসজিদের নীচে প্রবাহিত গ্যাসের  লাইন থেকে প্রতিনিয়ত গ্যাস লিকের কারণে মুসল্লিরা হর-হামেশাই গ্যাসের গন্ধ পাচ্ছিলেন । নির্দিষ্ট মহলে জানানো হলেও যথাযথ ব্যবস্থা নেবার কোন তোয়াক্কা করা হয়নি । তবে আগুনের উৎস খুঁজতে যেয়ে দুর্টি ব্যাখ্যা প্রাথমিক ভাবে প্রকাশিত হয় –

এক. এসি বিস্ফোরণে আগুন এর উৎস

ব্যাখ্যাটি তেমন জোড়ালো নয়। কারণ, সদ্য এসি সংযোজিত মসজিদটিতে যে ধরণের AC লাগানো হয়েছে তা SPLIT AC । এধরনের AC-তে দুটি অংশ থাকে একটি IN-DOOR UNIT অপরটি OUT-DOOR UNIT.

INDOOR UNIT- এ থাকে মূলত কিছূ বায়ু প্রবাহী তামার পাইপ থাকে। আর স্বল্প শক্তিতে চলতে পারে এমনি একটি ফ্যান এবং কন্ট্রোল ইউনিট । ইঞ্জিনিয়ারিং দৃষ্টিতে INDOOR থেকে বৈদ্যুতিক কারণে বিষ্ফোরণ অনেকটাই অসম্ভব ।

OUTDOOR UNIT -এ থাকে অধিক পাওয়ারে চলমান কম্প্রেশার আর একটি বড় ফ্যান ও তামার বায়ুপরিবাহী পাইপ। মূলত  AC জনিত বিষ্ফোরণ এখানেই হওয়া সম্ভব, যেহুতু কম্প্রেশার অনেকটাই প্রেসার কুকারের মত কাজ করে । অবশ্য AC- তে যে ধরণের REFRIGERANT ব্যবহার করা হয় তা, আগুন জ্বলতে তেমন সহায়ক নয় । অনেকে ভেজাল এর প্রসঙ্গ, টেনে নিম্নমানের AC তে প্রোপেইন ব্যবহারের কথা বলছেন ।  প্ৰোপেইন মূলত খাদ্য সংরক্ষণকারী FRIDGE এ বহু আগে ব্যাবহার করা হতো, যা এখন আর হয় না | AC তে ব্যবহৃত গ্যাস  হচ্ছে  R22, R401A অথবা R134 । আগুন সহায়ক মানদণ্ডে এরা MilD হিসেবেই গণ্য | বিশ্লেষণ থেকে আমরা এই ধারণায় আসতে পারি  প্রাথমিক ভাবে AC বিষ্ফোরণে আগুন লাগবার ঘটনাটা তেমন যুক্তিসংগত নয় |

দুই. লাইনের গ্যাসের লিক থেকে নিঃশরিত গ্যাসই আগুনের কারণ ।

আগুনের উৎসের সন্ধানে

পত্ৰ পত্ৰিকাতে আর বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশিত আলোকচিত্র ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় ঘটনাটি FLUSH-FIRE এর দিকেই ইংগিত করছে । গ্যাস সংযোগকারী লাইনের লিক থেকে অল্প মাত্রায় যে গ্যাস নিঃস্বরিত হচ্ছিল তা AC-র কারণে সৃষ্ট বায়ু প্রতিবন্ধী করা মসজিদ কক্ষে ধীরে ধীরে জমছিল এবং FLASH-FIRE তৈরি হবার মত পরিবেশের জন্ম দিয়েছিল । কোন কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং পরবর্তীতে বিদ্যুৎ এর পুনঃ সংযোগের কারণে কোথাও স্পার্ক তৈরি হয়েছিল এবং FLASH-FIRE এর সূচনা হয়, যা অতি অল্প সময়ে প্রচণ্ড তাপ সৃষ্টি করে এবং বিষ্ফোরণ ঘটায়।  প্রাথমিক ভাবে সৃষ্ট আগুনের তাপ এতই তীব্র ছিল যে মুহূর্তের মধ্যে উপস্থিত থাকা মুসল্লিদের দেহ ঝলসে দেয় এবং পরবর্তীতে তাদের নিরদারুণ কষ্টের মধ্য মৃত্যুযুদ্ধে অবতরণ করায় । তাপের কারণে AC-INDOOR UNIT এর প্লাস্টিক কভার মাখনের মত গলে যায়। আর এই দৃশ্য থেকেই হয়তো AC বিষ্ফোরণে আগুনের উৎপত্তি ধারণার জন্ম নেয় । বিষ্ফোরণে মসজিদ কক্ষের প্রায় সব জানালা দরজাই চূৰ্ণ বিচূৰ্ণ হয়ে যায়।

পরিত্রানের উপায়

সাবধানতা আর সামগ্রিক সচেতনতাই আগুন নামক মহাশক্তির হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে |  এধরনের আগুন তাৎক্ষনিক ভাবেই ঘটে। সেহেতু পূর্ব সচেতনতাই এধরণের দুর্ঘটনাকে কমিয়ে আনতে পারে । যখনই গ্যাস লিকের ঘটনাটি বুঝতে পারা গিয়েছিল তখনই এটা সংশোধন হবার আগে প্রয়োজনে সকল ধরনের মসজিদের কাজ কর্ম বন্ধ রাখা যেতো | বায়ুর প্রতিবন্ধকতা দূর করে AC না চালিয়ে জানালা খুলে রাখা যেত।  ফলে বায়ুপ্রবাহের কারণে দাহ্য গ্যাস আর জমতে পারতো না । এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে মসজিদ উত্তর-দক্ষিণে খোলা রেখেই ডিজাইন করা হয় ৷ যার ফলে মসজিদ কক্ষে বায়ুপ্রবাহ বাঁধা গ্রস্থ হবার সম্ভাবনা কম ।  লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন যাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এর পর পুনঃসংযোগ এর সাথে সাথে যেন AC আপনা আপনি চলা শুরু না করে । যে কোন পাবলিক প্লেস সর্বদাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখবার চেষ্টা করা এবং একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বায়ু প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করা । যাতে করে FLASH FIRE এর মত ঘটনার সম্ভাবনা কম যায় ।

নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় মৃত্যু মিছিল থামছেই না | না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন শিশু থেকে বৃদ্ধ অনেকেই। প্রশ্ন, আমরা জাতি হিসেবে কীভাবছি, দেশের পরিচালক সংস্থা গুলো কীভাবছে । অবশ্য বলা বাহুল্য আমি আপনিই হয়তো বা এধরণের সংস্থাগুলোর অধিকর্তাদের কেউ । ঘটনার পর পরই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে নানা রকমের বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা নানা শপথ আর BLAME GAME চলছেই |

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, মূল বিষয় নিয়ে আলাচনার সময় আবেগতাড়িত ব্যাখ্যাই খোরাক হয়েছে এবং হচ্ছে প্রতিনিয়ত । একটি সেমিনারে সনামধন্য বিজ্ঞানি ডাঃ যাহিদ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন মানুষ শাবক আর বানরের বাচ্চার মধ্যে বড় ফারাক হচ্ছে বানরের বাচ্চা কখনোই স্বেচ্ছোয় আগুনে হাত পোড়াবার সাহস দেখাবে না। আপর দিকে মনুষ্য শাবক আগুন ধরার চেষ্টা করবে। হয়তো হাত পুড়িয়ে জ্ঞানী হবে এবং শিখবে যে আগুণ খেলার বিষয় নয়।

উদাহরণটি যে দিকটি উন্মোচন করে তা হচ্ছে জ্ঞান মানুষকে সংযত করে সাবধান করে আর সমাজকে টিঁকিয়ে রাখতে সাহায্য করে | প্রশ্ন হলো, আর কত মৃত্যুর পর জাতি হিসেবে আমরা জ্ঞানী হবো?

 

 

আরও পড়ুন...

করোনায় আরও ৩২ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ২,২৩০

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে মঙ্গলবার স্বাস্থ্য …